নক্সাল বাড়ি নামের উৎস ও নক্সাল আন্দোলন

By Staff Reporter– 3rd June, 2017

উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় অবস্থিত নক্সালবাড়ি ব্রিটিশ শাসনের সময়ে জঙ্গলে পরিপূর্ন ছিল এবং এই সমস্ত জঙ্গলে বাঘ থাকত ।

 

এই অঞ্চলে শাল ও শেগুন এই দুধরনের গাছ বেশি দেখা যেত তবে তার মধ্যে শাল গাছ ছিল বেশী । পরবর্তী কালে কিছুলোক এই জঙ্গল পরিস্কার করে জমির দখল নিতে থাকে । তারা জমি দখল করা অঞ্চলগুলো কে বাড়ি বলে উল্লেখ করতো ।

এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় নক্সালবাড়ি নামটির নক শব্দটি এসেছে বাঘের “নখ” থেকে , সাল শব্দটি এসেছে “শাল গাছ” থেকে আর বাড়ি কথাটি এসেছে জমি দখল করা অঞ্চল -এর নাম বাড়ি থেকে । এইভাবেই নক্সালবাড়ি নামটির উদ্ভব হয়েছে ।নক্সালবাড়ি নকশাল-মাওবাদী বিদ্রোহের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

1965-66 সালে কমিউনিস্টরা ইতিমধ্যে নক্সালবাড়ী অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল । কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় নেতা চারু মজুমদার এবং সরোজ দত্ত, উভয়েই উত্তর পশ্চিম বঙ্গের সিপিআই (এম) -এর বামপন্থী নেতা ছিলেন ।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র একাংশ ১৯৬৭ সালে তাদের নেতৃবৃন্দের বিরোধিতা করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) একটি পৃথক উগ্র বামপন্থী দল গঠন করেন এবং সশস্ত্র বিপ্লবের সুপারিশ করে ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণের নিন্দা করে ।
১৯৬৭ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানিয়ে তথাকথিত “সিলিগুড়ী গ্রুপ” আন্দোলন শুরু করে । এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় চারু মজুমদার । চারু মজুমদার চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও সে তুং এর অনুসারী ছিলেন ।

তিনি মনে করতেন ভারতের কৃষক এবং গরিব মানুষদের মাও সে তুং এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্রেণিশত্রুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা । তার কারণ তারাই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকদের শোষণ করে ।
১৯৬৭ সালে মার্চের ৩ তারিখে, কিছু কৃষকেরা নক্সালবাড়ী অঞ্চলের একটি ভূমি জব্দ করে ফসল কাটার কাজ শুরু করে । তবে ১৪-ই মার্চ থেকে স্থানীয় ভূস্বামীদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করার কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয় । কৃষক ও জমিদারদের মধ্যে প্রথম সংঘর্ষ সংঘটিত হয় যখন জমিদারের লোক-জন বিদ্রোহী কৃষক বিজুল কিষানকে পিটিয়ে মেরে ফেলে ।

এই ঘটনার পর কৃষক কমিটি জমিদারের লোক-জনদের কাছ থেকে জমি, খাদ্যশস্য এবং অস্ত্র জব্দ করে নেয় । সরকার পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠিত করতে থাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন আনার জন্য । ঝাড়ুগাঁও গ্রামের ইনসপেক্টর কৃষক কমিটির সদস্যদের হাতে নিহত হওয়ায় তার ফলস্বরুপ প্রতিশোধের সময় 1967 সালে ২৫ শে মে মোট ১১ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ।

তাদের মধ্যে মহিলা ছিল ৭ জন ( ১. ধনেশ্বরী দেবী , ২. সীমাশ্বরী মল্লিক , ৩. নয়নেশ্বরী মল্লিক ৪. সুরাবালা বর্মণ ৫. সোনামতী সিং ৬. ফুলমাটি দেবী , ৭. সামসরি সৈবানি ) পুরুষ ছিল ২ জন (খারসিং মালিক ও গৌড্রৌ সৈবানি )এবং ২ জন শিশু তাদের নাম জানা যায় নি ।

এই ঘটনার পর পরিস্থিতি আর ও ভয়াবহ হয়ে ওঠে ।সরকার সেনাবাহিনী পাঠিয়ে এই আন্দোলন প্রতিহত করে । ত্রিবেণী কানু, সোবহাম, আলী গোর্খা মাজি ও তিলকা মাজীকেও হত্যা করা হয়েছিল তবে চারু মজুমদার-এর মতো প্রথম সারির নেতারা পলায়ন করেন । এই আন্দলন নকশালবাড়ির গন্ডী ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের নানা প্রান্তে ।

যেহেতু এই আন্দোলন প্রথম নক্সালবাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু হয় তাই এই আন্দোলন নকশাল আন্দোলন নামে পরিচিত । চারু মজুমদার নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার লেখনীর মাধ্যমে । তার বিখ্যাত রচনা হল ‘’’হিস্টরিক এইট ডকুমেন্টস্’’’ বা আট দলিল যা নকশাল আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে ।
কলকাতার ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল । ছাত্রদের একটি বড় অংশ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবী কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছিল । চারু মজুমদার শ্রেণীশত্রু খতম করার নির্দেশ দেন। এ শ্রেণীশত্রুদের মধ্যে যেমন ছিল ভূস্বামী তেমনি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ অফিসার, রাজনীতিবিদ এবং আরও অনেকে ।

পুলিশদের সাথে লড়ার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করেছিল নকশালপন্থী ছাত্ররা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে নিয়ে । প্রেসিডেন্সি কলেজ ছিল তাদের সদর দফতর । নকশালরা অল্পসময়ের মধ্যে ভারতের শিক্ষিত সমাজের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল ।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় নকশালদের উপর প্রতি-আক্রমণের নির্দেশ দেন । পুলিশকে কিছু মানবতা বিরোধী ক্ষমতা দেওয়া হয় । লক -আপ হত্যা, জেলবন্দী হত্যা ও ভূয়ো সংঘর্ষ দ্বারা পুলিশ বিভিন্ন সময় নকশালপন্থীদের হত্যা করেছে । তারা দেশের জনগন কে এ কথাও ভাল ভাবে বুঝিয়েছিল যে “দেশ এখন ঐ চরমপন্থীদের সাথে গৃহযুদ্ধে নেমেছে, এ যুদ্ধে গণতন্ত্রের নামে পরিহাসের কোন স্থান নেই।

কেননা ঐ চরমপন্থীদের কাছে গণত্ন্ত্র মূল্যহীন”। এর ফলে দেশবাসীর কাছে নকশালদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যায়, আর তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলরা মুখ ফিরিয়ে নেয় ।
দলের একটি বড় অংশ চারু মজুমদারের নির্দেশিত পথের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে । অন্যতম নেতা সুশীতল রায়চৌধুরী আত্মগোপন থাকা অবস্থায় মারা যান । ১৯৭২ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন চারু মজুমদার এবং আলীপুর জেলে মারা যান । সরোজ দত্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি, সম্ভবত তাকে হত্যা করা হয় । প্রধান নেতৃবর্গের বড় অংশই জেল বন্দী হন ।

অনেক বছর পরে অন্যতম প্রধান নেতা কানু স্যান্যাল ২০১০ সালের ২৩শে মার্চ পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ী থানার হাতিঘিষা গ্রামের নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।শারীরিক অসুস্থতা সইতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ।

More Updated News From Chakdaha 24x7